বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন ১০ অক্টোবর সকাল ১১ টায় ভারতের কলকাতার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এক এগারোর অগণতান্ত্রিক সরকারের রোষাণলে পড়ে দীর্ঘদিন কারাবরণকারী রোটনের রয়েছে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। সে সময়কার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী নিয়ে স্ম্ররতিচারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের প্রচার সম্পাদক জয়দেব নন্দী। তার ফেসবুক স্ট্যাটাস টি নিচে হুবহু তুলে ধরা হল-
১৪ জানুয়ারি। ২০০৭ সালের এই দিনে ১/১১-পরবর্তী সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রাজনৈতিক নির্যাতনের প্রথম শিকারদের একজন হিসেবে গ্রেপ্তার হন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন ভাই। দীর্ঘ ১৯ মাস বিনা বিচারে, ডান্ডাবেড়ি পরিহিত অবস্থায়, কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিন কাটাতে হয় তাঁকে!
রোটন ভাইয়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা—ছাত্রলীগের তৎকালীন সহসভাপতি মিজানুর রহমান, লাভলু মোল্লা শিশির, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবুল কালাম আজাদ, সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল হাসান জুয়েল ও তৌহিদুর রহমান কাজল ভাইদেরও সেদিন একই সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের ওপরও চালানো হয় নির্যাতনের স্টিমরোলার! বিনা বিচারে দীর্ঘ ১১ মাস কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে রাখা হয় তাঁদেরও।
কোনো মামলা নেই, কোনো অভিযোগ নেই—শুধু একটি পরিচয়, তাঁরা ছাত্রলীগের নেতা! তাঁদের অপরাধ, রোটন ভাই ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। একই ‘অপরাধে’ অভিযুক্ত করা হয়েছিল রোটন ভাইসহ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় এই ছয় নেতাকে।
সেদিনের সেই নির্মমতা, সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা আজও মনে পড়লে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী, আমাদের প্রিয় নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা নিতে সন্ধ্যায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নেত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও দিকনির্দেশনা নিয়ে তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন। এরপর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন ভাই তাঁর সহযোদ্ধাদের নিজ নিজ হলে পৌঁছে দিতে কার্জন হলের দিকে রওনা হন।
টিএসসি-কার্জন হলের রাস্তা থেকে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জলপাই রঙের পোশাকধারীরা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনসহ বাকি পাঁচ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতাকে বিনা কারণে আটক করে। সেখান থেকে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়াম মাঠে। এরপর শুরু হয় তাঁদের ওপর নির্মম নির্যাতন-নিপীড়ন।
আটক ছয় ছাত্রলীগ নেতাকে কীভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল, তা আমি নিজের চোখে রোটন ভাইকে দেখে কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম—যখন রাত দুইটার দিকে তাঁকে শাহবাগ থানায় এনে রাখা হয়।
রাত তিনটার দিকে তৎকালীন ছাত্রলীগের সহসভাপতি রাশেদুল মাহমুদ রাসেল ভাই আমাকে ফোন করে বললেন, “এক্ষুনি শাহবাগ থানায় আসো।”
আমি তখনও জানি না, কী ঘটেছে! রাসেল ভাই জানালেন, রোটনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে মাত্র তিন-চার দিন আগে। সেই সময় রাতে হল থেকে বের হয়ে বাইরে ঘোরাফেরা করাটাও ছিল বিপজ্জনক। বাইরে প্রচণ্ড শীত। দ্রুত বিছানা ছেড়ে শীতের পোশাক গায়ে দিয়ে হল থেকে বের হলাম। সঙ্গে ছিল বন্ধু কর্নেল।
শামসুন নাহার হল পার হওয়ার পর দেখি, জনশূন্য রাস্তায় সেনাবাহিনীর গাড়ি টহল দিচ্ছে। এক-দুই মিনিট পরপরই দু-একটি করে সেনাবাহিনীর গাড়ি চলে যাচ্ছে। টিএসসির ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’ ভাস্কর্যের পেছনে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলাম। আশপাশে সেনাবাহিনীর গাড়ি আর দেখছি না। এই সুযোগে এক দৌড়ে মিলন চত্বরে গিয়ে উঠলাম। সেখান থেকে আরেক দৌড়ে মসজিদ গেটের দিকে এগোলাম।
পাবলিক লাইব্রেরির সামনে সেনাবাহিনীর কয়েকটি টহলগাড়ি ছিল। দূর থেকে গাড়ির আলো দেখে বুঝতে পারছিলাম। তবুও এগিয়ে যাচ্ছিলাম। সিদ্ধান্ত নিয়েই রেখেছিলাম, রাস্তায় আটকালে বলব—বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে আমার এক আত্মীয় ভর্তি আছেন, জরুরি প্রয়োজনে আমাকে সেখানে যেতে হচ্ছে।
চারুকলার গেট পার হতেই দেখলাম, গাড়িগুলো শাহবাগ থানার ভেতরে ঢুকছে। দ্রুত হাঁটতে শুরু করলাম। সব গাড়ি থানার ভেতরে ঢুকে যাওয়ার পর সেই সুযোগে এক দৌড়ে থানার গেট পার হলাম।
গেটে ঢুকেই রাসেল ভাইকে দেখতে পেলাম। এগিয়ে গেলাম। ভাই বললেন, “বা দিকের রুমে রোটন আছে, যাও।”
রুমে ঢুকে রোটন ভাইকে দেখলাম!
প্রচণ্ড শীতের মধ্যে একটি চেয়ারে খালি গায়ে বসে আছেন। সারা শরীর ভেজা। থরথর করে কাঁপছেন। শরীরে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট।
আমার একটু আগে থানায় এসেছিলেন রিয়াজউদ্দিন চৌধুরী সুমন, নীলক্ষেত আবাসিক এলাকার ছোট রাসেল ভাই ও সুব্রত দা। আমরা কয়েকজন রোটন ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। আমার গায়ের চাদরটা রোটন ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিতেই পুলিশের ধমক! চাদরটা আর দেওয়া হলো না।
পরিবেশটা এমন ছিল যে, সেখানে একটা কথাও বলা যাচ্ছিল না। অথচ চোখের সামনে প্রিয় মানুষটির এমন অসহায় অবস্থা সহ্য করাও যাচ্ছিল না। অশ্রু বিসর্জন দেওয়া ছাড়া যেন আর কোনো উপায় ছিল না।
রোটন ভাইয়ের সেই অবস্থা দেখে বুঝে নিয়েছিলাম, বাকি পাঁচজনের অবস্থা কী হতে পারে!
সেই দিন থেকে টানা ১৯ মাস বিনা বিচারে, একের পর এক ডিটেনশন দিয়ে, ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রোটন ভাইকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে রাখা হয়। বাকি পাঁচ ছাত্রনেতাও ১১ মাস একইভাবে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে কারাগার থেকে মুক্তি পান।
রোটন ভাই দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিন কাটাচ্ছেন। একেকটি দিন যায়, একেকটি মাস পেরিয়ে যায়। বাইরে অপেক্ষায় রোটন ভাইয়ের আব্বা-আম্মা, অপেক্ষায় গোটা ছাত্রলীগ, অপেক্ষায় তাঁর অসংখ্য সহযোদ্ধা। সবার মনে একটাই প্রশ্ন—কবে মুক্তি পাবেন রোটন ভাই? কবে আবার ফিরে আসবেন আমাদের মাঝে?
এদিকে আমাদের প্রিয় নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করে রাখার কূটকৌশলে মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রিয় নেত্রীকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ‘ওরা’ যেন গোটা বাংলাদেশকেই অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। অবরুদ্ধ গণতন্ত্র, অবরুদ্ধ বাক্স্বাধীনতা, অবরুদ্ধ মুক্তচিন্তা।
কিন্তু কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে থেকেও রোটন ভাই থেমে থাকেননি। প্রিয় নেত্রীর মুক্তির আন্দোলনকে বেগবান করতে তিনি কারাগার থেকেই চিঠির মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি শেখ সোহেল রানা টিপু ভাই ও সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ সাকীব বাদশা ভাইকে নির্দেশনা দিতেন। ঢাকা শহরসহ সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের কাছে চিঠি পাঠিয়ে নেত্রীর মুক্তির আন্দোলন ত্বরান্বিত করার বার্তা পৌঁছে দিতেন।
মাসের পর মাস পেরিয়ে যায়। রোটন ভাই তখনও কারান্তরীণ। এরই মধ্যে কয়েকবার অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। কখনও তাঁকে নিয়ে আসা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, কখনওবা বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে। তখনও দেখেছি, তাঁর হাতে-পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরানো!
দু-দুবার তাঁকে মুক্তি দিয়ে আবারও জেলগেট থেকে আটক দেখিয়ে পুনরায় কারাগারে পাঠানো হয়। ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে কখনও তাঁকে নেওয়া হচ্ছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে, কখনওবা ময়মনসিংহ কারাগারে।
প্রিয় নেত্রীর মুক্তির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলো রোটন ভাইয়ের মুক্তির আন্দোলন। কিন্তু আমাদের মনে সংশয় কাটছিল না। আগের দুবারের মতো এবারও কি রোটন ভাইকে মুক্তি দিয়ে জেলগেট থেকেই আবার আটক করা হবে? আবারও কি তাঁকে ফিরতে হবে সেই অন্ধকার কারাকক্ষে? এই আশঙ্কা তাড়া করে ফিরছিল আমাদের সবাইকে।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের তৎকালীন সহসভাপতি হাসানুজ্জামান লিটন ভাই ও সহসভাপতি রাশেদুল মাহমুদ রাসেল ভাই এক সন্ধ্যায় আমাকে রোটন ভাইয়ের বাসায় ডাকলেন। রাসেল ভাই ও লিটন ভাই বললেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। সংগঠনটির একটি নাম ঠিক করতে হবে। পাশাপাশি ছয়-সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি আহ্বায়ক কমিটিও প্রস্তুত করতে হবে।
সেই রাতেই সংগঠনটির নাম ঠিক করলাম—**‘মানবাধিকার সচেতন শিক্ষার্থীবৃন্দ’।** রাসেল ভাই ও লিটন ভাইকে নামটি জানালাম। দুজনই নামটি পছন্দ করলেন।
পরদিন সন্ধ্যায় আহ্বায়ক কমিটি গঠনের জন্য অ্যানেক্স ভবনের মাঠে বসলাম। উপস্থিত ছিলেন সুব্রত রায় পলাশ, সাইদ মজুমদার, শওকত ইসলাম, মহিউদ্দিন, হেদায়েত উল্লাহ সরকার, কমল কর্নেলিউস, মশিউর রহমান রুবেল, পিন্টু, এরশাদুর রহমান চৌধুরী, মুক্তাদিউর রহমান শিমুলসহ আরও অনেকে।
অ্যানেক্সের মাঠে বসেই ‘মানবাধিকার সচেতন শিক্ষার্থীবৃন্দ’ সংগঠনের আহ্বায়ক হিসেবে জগন্নাথ হলের কমল কর্নেলিউসকে ঠিক করা হলো।
যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলো মশিউর রহমান রুবেল, এরশাদুর রহমান চৌধুরী, মুক্তাদিউর রহমান শিমুল, দেবাশিস আইচ, ধ্রুব, সূর্যসেন হলের সুমন (কিশোরগঞ্জ), জগন্নাথ হলের মোহন ও চারুকলার শেখ আসমানকে।
‘মানবাধিকার সচেতন শিক্ষার্থীবৃন্দ’-এর ব্যানারে শুরু হলো রোটন ভাইয়ের মুক্তির আন্দোলন। টানা কয়েক দিন চলল বিক্ষোভ মিছিল। এরপর উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি পেশ করা হলো। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রোটন ভাইয়ের মুক্তির দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে।
রোটন মুক্তির আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন, টিপু ভাই ও বাদশা ভাইয়ের পরামর্শ ও সহযোগিতা ছিল অকৃত্রিম। বিভিন্ন খসড়া লেখা ও প্রেস রিলিজ প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে রূপক ভাই সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছেন। চারুকলার নব ও রণের তত্ত্বাবধানে আসমান, দেব, সিনবাদ ও সুজন নিজেদের খরচে প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন প্রস্তুত করতে থাকেন।
এরই মধ্যে আবারও সেই পুরোনো দুঃসংবাদ! ময়মনসিংহ কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েও জেলগেট থেকেই আবার আটক হয়েছেন রোটন ভাই! তাঁকে আবারও কারান্তরীণ করে রাখা হয়েছে!
এই খবর শোনার পর সবার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। মুহূর্তের মধ্যে আবারও ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠল সবাই। শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকল উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবরুদ্ধ করে ফেলল।
‘মানবাধিকার সচেতন শিক্ষার্থীবৃন্দ’ উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিল। মশিউর রহমান রুবেল, এরশাদুর রহমান চৌধুরী ও মুক্তাদিউর রহমান শিমুলের সঞ্চালনায় চলতে থাকল উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও করে টানা অবস্থান কর্মসূচি। বিভিন্ন হল থেকে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা এসে জড়ো হতে থাকল সেখানে।
দেবপ্রসাদ দাঁর নেতৃত্বে চলতে থাকল রোটন ভাইয়ের মুক্তির দাবিতে প্রতিবাদী গান, দেশাত্মবোধক গান ও জাগরণের গান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলল অবস্থান কর্মসূচি। দীর্ঘ সময় ধরে অবরুদ্ধ থাকলেন উপাচার্য।
‘মানবাধিকার সচেতন শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ইতিমধ্যে আলটিমেটাম দিয়েছে—আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রোটন ভাইকে মুক্তি দেওয়া না হলে সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছাত্রধর্মঘট পালন করা হবে।
উপাচার্য ফায়েজ স্যার কয়েকবার শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করতে এলে তাঁকে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের প্রবল ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়। মানবাধিকার সচেতন শিক্ষার্থীদের দেওয়া আলটিমেটামের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে টিপু ভাই ও বাদশা ভাইয়ের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগও।
সেদিন রোটন ভাইয়ের আব্বার সেই আকুল উচ্চারণ আজও কানে বাজে—
**“আমার ছেলে জেল থেকে বের হয়ে না আসা পর্যন্ত আমি এখান থেকে (উপাচার্যের কার্যালয়) যাব না। রাতে অফিসের বারান্দায় শুয়ে থাকব।”**
একজন বাবার বুকভরা হাহাকার, সন্তানের জন্য বুকের ভেতর জমে থাকা অসহায় আকুতি—এই কথাগুলোর মধ্যে যেন তারই প্রতিধ্বনি শুনতে পেয়েছিলাম আমরা। কথাগুলো শুনে বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীরা যেন আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে উঠল। প্রিয় সহযোদ্ধা ভাইকে মুক্ত না করে সেদিন কেউ ফিরে যেতে রাজি ছিল না।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবস্থান কর্মসূচি চলতে থাকল। উপাচার্যের কক্ষের ভেতরে বৈঠক চলছিল, কিন্তু তখনও কোনো সদুত্তর আসেনি।
এরই মধ্যে খবর এল, বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা নিরসনে উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চার সদস্যের একটি দলকে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ডাকা হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে ‘মানবাধিকার সচেতন শিক্ষার্থীবৃন্দ’-এর ব্যানারে উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও করে অবস্থান কর্মসূচি চলছেই। রাত দশটার দিকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হলো।
অবশেষে সেই প্রতীক্ষিত খবর—**পরদিন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন ভাইকে ময়মনসিংহ কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হবে।**
দীর্ঘ অপেক্ষা, নিরন্তর আন্দোলন, অসংখ্য সহযোদ্ধার ত্যাগ ও অক্লান্ত প্রচেষ্টার পর যেন আশার আলো দেখা দিল। বুকের ভেতর জমে থাকা উদ্বেগের মাঝে স্বস্তির নিশ্বাস ফিরে এল। প্রিয় সহযোদ্ধা ভাইকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকলাম আমরা।
রোটন ভাইয়ের মুক্তির প্রক্রিয়াকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসার পেছনে ১/১১-পরবর্তী সময়ে কারানির্যাতনের শিকার হারুন স্যার, আনোয়ার স্যার ও মিজান স্যারের ভূমিকা লিখে শেষ করা যাবে না। তাঁদের অবদান আমাদের স্মৃতিতে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।
অবশেষে মুক্ত হলেন রোটন ভাই।
মুক্ত হয়ে রোটন ভাই প্রথমে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে ফুল দিলেন। কিন্তু সেদিন তিনি কোনো নেতাকর্মীর কাছ থেকে ফুল নেননি।
কেন নেননি?
কারণ, তাঁর প্রিয় নেত্রী তখনও কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি। নেত্রীকে মুক্ত না করে, তাঁকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে না দেখে, কীভাবে তিনি ফুল গ্রহণ করেন? কীভাবে উদ্যাপনের আনন্দে নিজেকে শামিল করেন?
রোটন ভাইকে সেদিন বলতে শুনেছিলাম—
*‘নেত্রী কারা-অভ্যন্তরে; ফুল নেওয়ার দিন এখন নয়। নেত্রী মুক্তি পাক, সেদিন ফুল নেব।’*
কথাটি শুধু কয়েকটি শব্দের সমষ্টি ছিল না। এর ভেতরে ছিল নেত্রীর প্রতি গভীর ভালোবাসা, রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা, সহযোদ্ধাদের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত আনন্দের চেয়েও বৃহত্তর সংগ্রামকে প্রাধান্য দেওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
নিজে দীর্ঘ ১৯ মাস কারাগারে কাটিয়েছেন, ডান্ডাবেড়ি পরেছেন, নির্মম নির্যাতন সহ্য করেছেন—তবুও নিজের মুক্তির আনন্দকে বড় করে দেখেননি। তাঁর ভাবনাজুড়ে ছিলেন প্রিয় নেত্রী, তাঁর মুক্তি এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম।
আজও সেই উচ্চারণ কানে বাজে—‘নেত্রী মুক্তি পাক, সেদিন ফুল নেব।’
কী অসাধারণ ভালোবাসা! কী গভীর বিশ্বাস! কী অবিচল রাজনৈতিক অঙ্গীকার!
কিছু মানুষ তাঁদের বিশ্বাস ও আদর্শকে শুধু মুখের কথায় নয়, জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে ধারণ করেন। রোটন ভাই ছিলেন তেমনই একজন মানুষ—যাঁর কাছে ব্যক্তিগত প্রাপ্তির চেয়ে আদর্শের প্রশ্নটি ছিল অনেক বড়।
১৪ জানুয়ারির সেই গ্রেপ্তার, কারাগারের অন্ধকার দিনগুলো, ডান্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় তাঁর অসহায় উপস্থিতি, সহযোদ্ধাদের উদ্বেগ, মুক্তির দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং অবশেষে মুক্ত হয়ে ফুল গ্রহণ না করার সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত—সবকিছু আজও স্মৃতির পাতায় জীবন্ত হয়ে আছে।
সেই সময়ের প্রতিটি স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুঃসময়ে আদর্শের প্রতি অবিচল থাকা কতটা কঠিন, আর সেই আদর্শকে বুকে ধারণ করে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়া কতটা মহৎ।
রোটন ভাই, আপনার সেই উচ্চারণ, সেই বিশ্বাস, সেই অবিচল নিষ্ঠা আমাদের স্মৃতিতে চিরকাল অমলিন থাকবে।
‘নেত্রী মুক্তি পাক, সেদিন ফুল নেব’—এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন ধরা আছে একটি সময়ের ইতিহাস, একজন রাজনৈতিক সহযোদ্ধার ভালোবাসা এবং আদর্শের প্রতি আমৃত্যু অঙ্গীকার।'
লেখক:
জয়দেব নন্দী
প্রচার সম্পাদক
বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: